সুমন ভৌমিকঃ ইতিহাসের সাক্ষী এই সেই ছবি। ৪৮ বছর আগের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের সেই গর্বিত মিছিল এর সাদা-কালো একটি ছবি-আজ ইতিহাস। ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত দিবসের স্মারক ছবি। বিজয় মিছিল। মিছিলের অগ্রভাগে পাশাপাশি মিত্রবাহিনীর প্রধান ব্রিগেডিয়ার সানথ সিং বাবাজী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব অধ্যক্ষ মতিউর রহমান।
জয় বাংলা ধ্বনিতে প্রকম্পিত ব্রহ্মপুত্র পাড়ের জেলা শহর ময়মনসিংহ। ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় পথ। আজ সেই ঐতিহাসিক ১০ ডিসেম্বর।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। এর মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যে ময়মনসিংহের খাগডহর যুদ্ধ শুরু হয়। যে যুদ্ধে বাঙ্গালীর বিজয় হয়। খতম হয় ১২১জন পাকসেনা। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষনার পর শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধে প্রথম বিজয় অর্জিত হয় ময়মনসিংহে। সেই ময়মনসিংহেই ১০ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা জনতার বিজয় মিছিলের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদিগন্ত বিজয় মিছিল এগিয়ে যায় ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের পরম সন্ধিক্ষণে। মুক্তিযুদ্ধে ময়মনসিংহ তাই এক অনন্য গর্বিত অধ্যায়।
ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্থানের হানাদার বাহিনীর কবল থেকে ময়মনসিংহকে মুক্ত করেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা।
এ উপলক্ষে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ যৌথভাবে সাত দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করে যা মুক্তদিবস-মুক্তমঞ্চের ঐতিহ্য। প্রতি বছরের মত এবারও মহানগরের ছোটবাজার মুক্তমঞ্চে ব্যাপক কর্মসূচীর মধ্যে দিবসটি উদযাপিত হতে যাচ্ছে। সকালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর মুক্তিযোদ্ধা-জনতা বিজয় র্যালী এবং বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত স্মৃতিচারণ, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে।
দীর্ঘ ৪৮ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল সাক্ষী মুক্ত ময়মনসিংহের বিজয় মিছিলের সেই ছবি। যা প্রতি বছরই গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত হয়ে ময়মনসিংহের বিজয় গাঁথাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। অবিস্মরণীয় ১০ ডিসেম্বর, ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস।
সেদিন ছিল, অন্যরকম এক সকাল। ব্রহ্মপুত্র তীরে কুয়াশার অন্ধকার ঠেলে উঠে ভোরের সূর্য। আকাশছোঁয়া গর্ব নিয়ে উড়ে লাল-সবুজের পতাকা। মুক্ত আকাশে বিজয়ের প্রতিধ্বনি। জয় বাংলার কোরাস সবার কন্ঠে। স্মরণকালের ইতিহাস সৃষ্টিকারী বিজয় মিছিলের অগ্নিদীপ্ত উল্লাসে বিজয় আনন্দে সেদিন মেতে উঠেছিল ময়মনসিংহ। এদিন মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী যৌথভাবে পাকসেনাদের কবল থেকে ময়মনসিংহকে মুক্ত করে।
তার আগে। ৯ ডিসেম্বর মধ্যরাতের পর পাকহানাদার বাহিনী ময়মনসিংহ ছেড়ে পালিয়ে যাবার সময় ব্রহ্মপুত্র রেল ব্রিজ ধ্বংস করে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় ওরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে তাদের সেনানিবাস গুটিয়ে পালিয়ে যায়।
অন্যদিকে, মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে রেলির মোড় থেকে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে মুক্ত ময়মনসিংহে বিজয় র্যালী করে। চারদিক থেকে হাজারো মানুষ যোগ দেয় মুক্তির এই আনন্দ মিছিলে। মিছিলটি সার্কিট হাউজে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। সেখানে আনুষ্ঠানিক ভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।
কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই ১০ ডিসেম্বর সকালে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ পার হয়ে ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশ করতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধারা।
মিত্রবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সানথ সিং বাবাজী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের নেতৃত্বে নগরে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবেশ করে ও তাদের নেতৃত্বে শুরু হয় বিজয় মিছিল।
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ১১ নম্বর সেক্টরের এফ জে মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর ১৩ রাজপুত রেজিমেন্ট ও ৯৫ ব্রিগেডের ৫৭ মাউন্ট ডিভিশন যৌথভাবে ময়মনসিংহ অঞ্চলে অবস্থানরত হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিকল্পনা করে।
আর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ওই দিনই ক্যাপ্টেন বালজিৎ সিংহের অধীনে বেশ কয়েকটি মুক্তিবাহিনীর কোম্পানি জেলার সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট দিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর একের পর এক আক্রমণের পাশাপাশি মিত্রবাহিনী আকাশযুদ্ধের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের বাংকারগুলো লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালায়। এতে হানাদার বাহিনী পিছু হঠতে শুরু করে।
৯ ডিসেম্বর পাকি সেনারা প্রথমে ফুলপুর ও পরবর্তীতে তারাকান্দা, শম্ভুগঞ্জ ও ময়মনসিংহ নগর ছেড়ে টাঙ্গাইল জেলা হয়ে ঢাকায় পালিয়ে যেতে শুরু করে। পাক সেনারা পালিয়ে যাওয়ার আগে স্থানীয় রাজাকার ও আল বদরদের সহায়তায় অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে।
পরদিন ৪ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে প্রথমে ভারতীয় সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট শত্রæমুক্ত করে। এতে হানাদার বাহিনী আরও পিছু হটে পাশ্ববর্তী ফুলপুর, তারাকান্দা ও ময়মনসিংহ সদরের শম্ভুগঞ্জ এসে জড়ো হতে শুরু করে।
তারা যুদ্ধের কৌশল হিসাবে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরা স্থলপথে যাতে তাদের কাছে না আসতে পারে সেজন্য ময়মনসিংহ-হালুয়াঘাট সড়কের ব্রিজ ও কালভার্টগুলোতে মাইন পুঁতে রাখে। কিন্তু তাদের এমন রণকৌশল সত্তেও মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরা অতি সাবধানতা অবলম্বন করে স্থলপথে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আস্তানার দিকে এগুতে শুরু করে এবং অত্যন্ত সফলভাবে তাদের ওপর আঘাত হানতে সক্ষম হন।
পরিস্থিতে সামাল দিতে না পেরে ৯ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পর্যায়ক্রমে ফুলপুর, তারাকান্দা, শম্ভুগঞ্জ ও ময়মনসিংহ শহর ছেড়ে টাঙ্গাইল জেলার ভেতর দিয়ে ঢাকায় পালিয়ে যেতে শুরু করে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বরের দৃশ্যপট ছিল এমনই। সেই স্মৃতি আজও অম্লান ইতিহাসের পাতায়।
মুক্তিযোদ্ধারা অদম্য লড়াই চালিয়ে এই দিন জেলা শহর পুরোপুরিভাবে পাক হানাদার বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত করেন।
এই মহান দিবস উদযাপনের মধ্য দিয়ে গোটা ময়মনসিংহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হওয়ার পাশাপাশি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে জানা-অজানা শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।
১৯৭১-এর ২৫ মার্চে ঢাকা শহরে গণহত্যা শুরুর অব্যবহিত পরে ময়মনসিংহের সংগ্রামী জনতা খাগডহরস্থ তৎকালীন ইপিআর ক্যাম্প ঘেরাও করে এবং বাঙ্গালী ইপিআর সদস্যদের সহায়তায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে। ২৭ মার্চ রাত ১২টার দিকে বাঙ্গালী সিপাহীরা প্রথম আক্রমন রচনা করে। এ যুদ্ধে বাঙ্গালী ইপিআর সদস্য দেলোয়ার হোসেন প্রথম শহীদ হন।
যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এক সকালে পুরাতন বিডিআর ভবনের ৩য় তলার শীর্ষে হাজার হাজার লোকের জয় বাংলা ধ্বনির মধ্যে বাংলাদেশের নকশা খচিত পতাকা পতাকা উত্তোলন করেন সাবেক কমান্ডার জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মোঃ সেলিম সাজ্জাদ। এ সময় আবুল হাসেম, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, নাজিম উদ্দিন আহমেদ, ম হামিদ প্রমুখ ভূমিকা রাখেন।
খাগডহর যুদ্ধে বাঙ্গালী সাধারণ সিপাহীরা যুদ্ধ করে পাক ইপিআরদের পরাজিত ও খতম করেন। শেখ হারুন, নান্নু, আফতাব, আনিস, জয়নাল, কাজী সাঈদ, ওয়্যারলেস অপারেটর ফরহাদ, বাবু মান্নান সহ প্রমুখ সিপাহীরা খাগডহর যুদ্ধের বীরত্ব গাঁথার অংশীদার। যুদ্ধে বেলুচ, পাঞ্জাবী, পাঠান অর্থাৎ পাক ইপিআরদের ১০৪ জন যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত ও ১৭ জন ধৃত হয়ে পরে নিহত হয়। মোট ১২১ জন হানাদার বাহিনীর সকলেই নিহত হয়। বিপরীতে ৬ জন বাঙ্গালী শহীদ হন।
২৮ মার্চ সকালে এই যুদ্ধের চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। এটিই মহান মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রথম বিজয়। খাগডহর যুদ্ধে বাঙ্গালী ইপিআর ও পুলিশের সদস্যসহ হাজার হাজার সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করে। যা এক ইতিহাস। এই যুদ্ধ জয়ের ফলাফলে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত ময়মনসিংহ ছিল হানাদার মুক্ত, স্বাধীন।
মুক্তিবাহিনী ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর হালুয়াঘাট হানাদার মুক্ত করে এবং ৮ ডিসেম্বর ফুলপুর এবং ভালুকা উপজেলা পরবর্তীতে গৌরীপুর, ত্রিশাল, ঈশ্বরগঞ্জ এবং তারাকান্দা মুক্ত করা হয়। ১০ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর কবল থেকে ময়মনসিংহ শহর মুক্ত করেন।


