উর্মিবাংলা প্রতিদিন অনুসন্ধানে উঠে এলো তথ্য
সুমন ভৌমিকঃ সম্প্রতী আরেক দফা আগুন লাগে ময়মনসিংহ নগরীর গাঙ্গিনারপাড়ের হকার্স সুপার মার্কেটে। এ নিয়ে সমসাময়িক সময়ে আশপাশ মিলিয়ে তিনবার আগুন লাগে এই এলাকার দোকানঘরে। গত শনিবার (২২ অক্টোবর) সকালে আগুন লাগে হর্কাস মাকের্টে, দোকান পুড়ে ছাই। এর অনুসন্ধানে উর্মিবাংলা প্রতিদিন তথ্য সংগ্রহে নামলে বহুল প্রচারিত এই দৈনিকের হাতে আসে বেশ কিছু লোমহর্ষক শিহরিত ছবি। জন্ম দেয় অনেক প্রশ্নের।
উর্মি বাংলা প্রতিদিন অনুসন্ধানে উঠে আসে গত শনিবার সকাল ৮টার কিছু সময় পর মাঝ বয়সী এক যুবক হর্কাস মার্কেটের মহসিন টেইলার্স বন্ধ দোকানে একটি কৌটা থেকে বালি সদৃশ বস্তুু ছড়িয়ে দিচ্ছে। আর একটি ছবিতে দেখা গেছে সেই ব্যক্তি আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে সেখানে। এতে একটা বিষয় পরিস্কার বোঝা গেলো, আগুন লাগেনি-পরিকল্পিতভাবে লাগানো হয়েছে। নিছক প্রতিহিংসা পরবশ এমন কাজ করেছে, না কি অন্য কোন উদ্দেশ্য রয়েছে এর পেছেনে। তা খতিয়ে দেখার বিষয়। কেনো এ মার্কেটে দু’দিন পরপর আগুন লাগবে? কোন হীন উদ্দেশ্যে এমনটি হচ্ছে? কোন চক্র এমন হীন ষড়যন্ত্রে মেতেছে?
অনেকের ধারনা এমনটি করে যদি এই বিশাল ওয়াকফ সম্পত্তিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করা যায়, তবে মুনাফায় থাকবে অনেকেই। ময়মনসিংহের বিভিন্ন অসাধু চিন্তার ধারক, অসুস্থ রাজনৈতিক বলয় প্রধানগণ এমন হীন কাজ করে থাকতে পারে! এ মার্কেটে উন্নয়ণ সমিতি’র কমিটি নিয়ে দু’টি গ্রুপের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান রয়েছে, যেখানে হাতা-হাতি ও রক্তাতের ঘটনাও ঘটেছে। দুই গ্রুপের মারামারির অভিযোগ কোতোয়ালী মডেল থানায় রয়েছে বলে সুত্র জানায়। বারবার আগুন লাগালে এখানে ব্যবসায়ী কমতে শুরু করবে, আজ একজন-কাল অন্যজন-পরশু আবার অন্যজন। এভাবেই ব্যবসায়ী হারাবে এ মার্কেট।
সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে মার্কেটের ভিতরে ব্যাগ হাতে চশমা-মাস্ক পরিহিত এক মাঝ বয়সী যুবক প্রবেশ করছে। সেখানে সে গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন লাগিয়ে বেরিয়ে যায়। পরে সব ধোঁয়া আচ্ছন্ন হয়ে যায়। কে এই যুবক? কার ইঙ্গিতে এমন কাজ করলো? আর ঐ সময়ে মার্কেট নিরাপত্তাকর্মী কোথায় গেলো? এমন বহু প্রশ্ন রয়েছে।
গত শনিবার সকালে আগুন লাগার সংবাদের পরপরই ব্যবসায়ীদের তৎপরতা ও ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিট প্রায় দেড় ঘন্টার চেষ্টায় আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। ঐ মার্কেটে ৫টি দোকান একেবারে ভস্মীভুত হয়। ফায়ার সার্ভিসের পানির দেয়ায় ও মালামাল দ্রুত সরানোর সময় আরো ৪০-৫০টি দোকানের মালামাল ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগীয় উপ-পরিচালক মতিয়ার রহমান নিজে ঘটনাস্থলে বলেন, সাড়ে ৮টার দিকে আগুনের খবর পেলে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুনের ব্যাপক তীব্রতা দেখে আশপাশের বেশক’টি ইউনিটের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রনে আসে। নগরীর রাস্তা সরু এবং পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা না থাকায় আগুন নেভাতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে। আগুনের সূত্রপাত বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের থেকে আগুন লাগতে পারে বলে জানান। আর ক্ষয়ক্ষতির পরিমান ব্যবসায়ীরা জানান, দোকান ঘর ও মালামাল নিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে।
মার্কেট সংলগ্ন মসজিদে ওজুর জন্য পানির জলাধার ছিলো, কিছু ব্যক্তির স্বার্থোদ্ধারে ও মসজিদের উন্নয়নের নামে তা বন্ধ হয়ে যায়। সেই জলাধার থাকলে আরো দ্রুত সময়ে আগুন নেভানো সম্ভব হতো বলে একটি মহল ক্ষোভ প্রকাশ করে।
গাঙ্গিনারপাড় হকার্স সুপার মার্কেটে সব মিলিয়ে ১৩৮টি দোকান রয়েছে। যার মাঝে মেশিনারীজ, জুতা, শাড়ী-গার্মেন্টস, কসমেটিক্স, টেইলারিং ও মৌসুম অনুযায়ী কাপড় বিক্রির দোকানঘর রয়েছে। এ নিয়ে গত ৫ বছরে তিনবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও কোন তদন্ত রির্পোট দেখেনি কেউ। ২০১৮ সালের ৭ জুন ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে মার্কেটের সবকটি দোকান পুড়ে যায়। ব্যবসায়ীরা ঈদের বাজার ধরতে ধার-দেনা করে দোকানে প্রচুর মালামাল তুলেছিলো, রাতে লাগা আগুনে সব পুড়ে ছাই। সেই লোকসান এখনো কাটিয়ে উঠেনি ব্যবসায়ীরা। এর মাঝে মার্কেট সংলগ্ন সাইকেল এর দোকানে আগুন লাগে। সাইকেলের দোকান মূল সড়কের পাশে হওয়ায় দ্রুত নেভাতে সক্ষম হয় আগুন নির্বাপণ কর্মীরা। গত শনিবার (২২ অক্টোবর) সকালে মহসীন টেইলার্স থেকে আগুনের সুত্রপাত হলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে ৫টি দোকান পুড়ে যায়। আগুনে লাকী মেশিনারিজ, আনোয়ার মেশিনারিজ, বুলবুল সু ও মহসিন টেইলার্স দোকানের মালামাল সম্পূর্ন পুড়ে যায়।
মার্কেটের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, প্রতিদিন আতংকের মধ্যে কাটাতে হয়। পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে এখানে একটি সাব-মার্সিবল বসানো হয়েছে। সেই সাব-মার্সিবল পাম্পের পানি ব্যবহার করে আমরা পুরো মার্কেটের বড় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছি।
নাইট গার্ড মনির হোসেন জানায়, মার্কেট সমিতি সভাপতি’র বাড়িতে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা কাজের জন্য ডাকলে সে ঐ দিন সকাল আটটার দিকে মার্কেট থেকে চলে যায়। পরে সে শুনতে পায় মার্কেটে আগুন লেগেছে। ফিরে এসে আগুন নেভানোর কাজে নামে।
অপর নাইট গার্ড অজিত চন্দ্র বর্মণ জানায়, ঘটনার কিছু আগে মনির চলে গেলে আমিও চা খাওয়ার জন্য বাহিরে যাই। ফিরে আসলে দেখি আগুন লেগে মোহসিন টেইলার্স থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। হাতের কাছে থাকা অগ্নি নির্বাপণ সিলিন্ডার দিয়ে নেভানোর চেষ্টার করা হলে সেটিও ফুরিয়ে যায়। সাবমর্সিবল পাম্পের পানি দিয়ে নেভানোর চেষ্টা করি, সেই সাথে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেয়া হয়। পরে তারা আগুন নেভায়।
প্রবীন ব্যবসায়ী মরহুম গিয়াস উদ্দিন ফকির সাহেবের ছেলে গাঙ্গিনারপাড় হর্কাস মার্কেট উন্নয়ন সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক মো. মুখলেছুর রহমান জানান, এ ঘটনায় আইনী সহায়তা নেয়ার এখনই সময়। কেনো-কোন উদ্দ্যেশে এই মার্কেটে আগুন লাগছে। কার স্বার্থোদ্ধারে এমন হীন গর্হিত কাজ হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন মহলকে এনিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, বারবার ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। বিগত সময়ের আগুন লাগার ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো সঠিকভাবে জানা যায়নি। মো. মুখলেছুর রহমান এবারের আগুন লাগার বিষয়ে তিনি ছবি দেখে বিষ্ময় প্রকাশ করেন। তিনি দ্রুত তদন্তের দাবি করে ক্ষতির হীন মানসিকতার ব্যক্তির মুখ উন্মোচন করতে প্রশাসনসহ সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।


