স্টাফ রিপোর্টারঃ রেলওয়ে উন্নয়নে সরকারের আন্তরিকতার কমতি নেই। নেয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। চলমান আছে অর্ধশত প্রকল্প। সেই সঙ্গে আছে ৩০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনাও। এরই অংশ হিসেবে হাতে নেয়া হয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দ্রুতগতিসম্পন্ন বুলেট ও বৈদ্যুতিক ট্রেন পরিচালনার।
আর প্রতি বছরই বিভিন্ন রুটে নামছে নতুন নতুন আন্তঃনগর ট্রেন। কিন্তু সবকিছুই এক রকম নিষ্ফল করে দিচ্ছে জরাজীর্ণ রেললাইন। যে পথ দিয়ে ট্রেন চলাচল করে সেই রেলপথ দেখার যেন কেউ নেই। রেললাইন সংস্কার, মেরামত ও পরিদর্শনে এক রকম নির্বিকার দায়িত্বপ্রাপ্তরা।
১৩৩ বছরের পুরোনো পুরনো সেতু। নেই কোনো সংস্কার, নেই কর্তৃপক্ষের যথাযথ দৃষ্টি। ময়মনসিংহের কেওয়াটখালীতে ব্রহ্মপুত্র নদের উপরের এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করছে প্রায় অর্ধ শতাধিক ট্রেন। ময়মনসিংহ অঞ্চলের রেলপথে এমন আরও দুটি সেতু রয়েছে। যার উপর দিয়ে মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে রেল চলাচল করছে।
জানা যায়, ১৮৮৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ রেলওয়ে জংশন স্টেশন উদ্বোধন করা হয়। এ জংশন হয়ে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা, ভৈরব, মোহনগঞ্জ, জারিয়া-ঝাঞ্জাইল ও জামালপুরের পাঁচটি রেলপথ রয়েছে। রেলওয়ের ময়মনসিংহ সাব-ডিভিশনের অধিনে ময়মনসিংহ-শ্রীপুর সেকশনে ৯২টি, ময়মনসিংহ-বিদ্যাগঞ্জ সেকশনে ৩২টি, ময়মনসিংহ-গৌরপুর সেকশনে ২৭টি, গৌরীপুর-আঠারোবাড়ি সেকশনে ২৭টি, গৌরীপুর-মোহনগঞ্জ সেকশনে ৮২টি, শ্যামগঞ্জ-জারিয়া সেকশনে ২৫টিসহ মোট ২৮৫টি ছোট-বড় ব্রিজ ও কালভার্ট রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি বড় ব্রিজ রয়েছে, যা ময়মনসিংহ নগরীর কেওয়াটখালি সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর প্রায় ৯০০ মিটার ব্রহ্মপুত্র রেলওয়ে ব্রিজ রয়েছে।
এ ছাড়া ময়মনসিংহ-ঢাকা রেলপথে কাউরাইদ রেলস্টেশন সংলগ্ন সুতিয়া নদীর ব্রিজ এবং ময়মনসিংহ-মোহনগঞ্জ রেলপথের ঠাকুরাকোণার বারহাট্টায় কংস নদীর উপর রেল ব্রিজ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ধ্বংস করা ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর নির্মিত রেলওয়ে ব্রিজটি পুনঃসংস্কার করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ব্রহ্মপুত্র নদের এ ব্রিজটি কোনো সংস্কার করা হয়নি। ফলে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্রিজটির ৬৬২টি স্লিপাপারের মধ্যে প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি স্লিপার জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। অনেক স্লিপার পচে গিয়ে ভেঙে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক স্লিপারের নাটবোল্টু খসে পড়েছে। রাতে লাইনের স্লিপার ও নাটবোল্টুসহ গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম চুরি হচ্ছে। দীর্ঘ দিন ধরে সংস্কার না করায় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ব্রিজটি।
স্থানীয়রা জানান, ব্রিজের বেশির ভাগ স্লিপার নষ্ট। মাদকাশক্তরা নাটবোল্টুসহ স্লিপার ও ফিটিংস খুলে নিয়ে যায়। প্রায়ই ট্রেন চলাচলের সময় ঘর্ষণে আগুনের বিচ্ছুরণ হয়। এ দিকে শতাধিক বছরের পুরোনো প্রহ্মপুত্র ব্রিজে রেলিং বা সেইফ গার্ড নেই। ব্রিজের ওপর অবস্থান করা নিষেধ থাকলেও শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। ট্রেন চলাচলের সময় বিপদে পড়ে অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হন।
এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্র ব্রিজের কাছে কেওয়াটখালি সড়কের ওপর ওভারব্রিজটির অবস্থা খুবই করুণ। এ ব্রিজটির বেশির ভাগ স্লিপার ভেঙে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। নাটবোল্টু খসে পড়েছে। টুকরো টুকরো কাঠের জোরাতালি দিয়ে সংস্কার করা হয়েছে। শম্ভুগঞ্জ রেলস্টেশনসংলগ্ন ‘কোরেরপাড়’ নামক রেলওয়ের ব্রিজটি ১৯৮৮ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পর পুনঃসংস্কার করা হয়। এরপর আর স্লিপার বসানো হয়নি। রেলওয়ের এই দু’টি ব্রিজ ও একটি ওভারব্রিজের ওপর দিয়ে ব্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, ভৈরব, মোহনগঞ্জ ও জারিয়া-ঝাঞ্জাইলগামী চারটি আন্ত:নগর ট্রেনসহ বেশ কয়েকটি লোকাল ও কমিউটার ট্রেন চলাচল করায় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ওই অঞ্চলের ট্রেন যাত্রীরা।
ময়মনসিংহ-ঢাকা রেলপথের শ্রীপুর পর্যন্ত ময়মনসিংহ সেকশনে ২৯টি ব্রিজ-কালভার্ট রয়েছে। এর মধ্যে কাওরাইদ রেলস্টেশন সংলগ্ন সুতিয়া নদীর ওপর ব্রিজ ও গফরগাঁও ও মশাখালী স্টেশনের মাঝামাঝি ভাসুটিয়া ব্রিজ ঝুঁকিপূর্ণ। কাওরাইদের সুতিয়া ব্রিজটি চার বছর আগে এবং ভাসুটিয়া ব্রিজটি ২০০৭ সালে সংস্কার করা হয়।
রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (এইএন) সুকুমার বিশ্বাস জানান, এই সাব-ডিভিশনে ট্রেন চলাচলের ঝুঁকিপূর্ণ কোনো ব্রিজ-কালভার্ট নেই। কিছু ত্রুটি থাকলেও বিপদজনক নয়। স্লিপারসহ নাটবোল্টু ও অন্যান্য ফিটিংস সামগ্রীর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর লেখা হয়েছে। বরাদ্দ পেলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংস্কার করা হবে।
অন্যদিকে এ রেলসেতুর বিভিন্ন সমস্যার কথা স্বীকার করলেও এটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ নয়’ বলে দাবি করেন ময়মনসিংহ রেলের জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকোশলী রেজাউল করিম (পথ)। তিনি বলেন, ‘এটি একটি কেপিআই স্থাপনা। এর ১০ শতাংশের মতো সমস্যা আছে। কয়েকদিন আগেও কেপিআই ভিজিট সম্পন্ন হয়েছে।’
সরেজমিনসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের প্রায় ৩ হাজার ৩৩৩ কিলোমিটার রেলপথের বিভিন্ন স্থানে প্রায় সময়ই খোলা থাকে ফিশপ্লেট, ক্লিপ, হুক, নাটবল্টুসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ। এমনকি রেললাইন মজবুত ও স্থিতিশীল রাখতে স্থাপিত স্লিপারগুলোর অবস্থাও নাজুক।
আবার এসব স্লিপারকে যথাস্থানে রাখতে যে পরিমাণ পাথর থাকা প্রয়োজন, অধিকাংশ স্থানেই তা নেই। কোনো কোনো স্থানে পাথরশূন্য অবস্থায় আছে স্লিপারগুলো। শুধু তাই নয়, সারা দেশে আছে ৩০০৬টি রেলসেতু। যার ৯০ শতাংশই তৈরি হয়েছে ব্রিটিশ আমলে। জোড়াতালি দিয়ে কোনোরকমে সচল রাখা হয়েছে সেতুগুলো। এগুলোর ওপর দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে চলছে বিভিন্ন রুটের ট্রেন। সব মিলিয়ে এক রকম ‘মৃত্যুফাঁদ’-এ পরিণত হয়েছে গোটা রেলপথ।
জরুরি ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব রেললাইন ও সেতু সংস্কার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা না হলে কুলাউড়ার মতো ফের বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর কিছু সময়ের জন্য তৎপর হয়ে ওঠে দায়িত্বপ্রাপ্তরা। নেয়া হয় নানা পদক্ষেপ। গঠন করা হয় একের পর এক তদন্ত কমিটি। কিন্তু অধিকাংশ কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না।
আবার যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, সেগুলোর সুপারিশমালার বেশির ভাগই থাকে অবাস্তবায়িত। সম্প্রতি কুলাউড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতু ও লাইন বর্ষার আগেই সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এ নির্দেশের পরও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।


