উর্মিবাংলা প্রতিদিন রিপোর্ট: ১৯৭৩ সালের কথা। ময়মনসিংহ ব্রহ্মপুত্র পাড়ে ৮০ একর সম্পত্তি বস্তিবাসীকে এক বছরের জন্য লিজ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। জনশ্রæতিতে ফিরে এসেছে সে কথা। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ৪৬ বছর চলছে। ব্রহ্মপুত্র উপকন্ঠে শহররক্ষা বাঁধে বস্তিবাসীরা আছে। সংখ্যায় এখন ওরা প্রায় ৪০ হাজার। এতোদিন তাদের বাস্তহারা জীবন চলছিল কোনরকম। এখন হঠাৎ তারা পড়েছে উচ্ছেদ আতংকে।
বঙ্গবন্ধু তনয়া প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বিখ্যাত উক্তির কথাই কেবল তারা স্মরণ করছে। বস্তিবাসীদের মনে ভরসা প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি।
মানবতার জননী শেখ হাসিনা বলেছেনÑপুনর্বাসন বা আবাসনের আগে দরিদ্র্র মানুষজনকে তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না। কিন্তু ময়মনসিংহে কোনরকম পুর্নবাসন ছাড়াই উচ্ছেদ হতে বসেছে হাজার হাজার বস্তিবাসী পরিবার। মাত্র ১ মাসেরও কম সময়ে তাদের ৪৬ বছরের বসতি সরিয়ে নিতে নির্দেশজারী করেছে প্রশাসন। অন্যথায় শুরু হবে উচ্ছেদ অভিযান।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ১৮ নং ওয়ার্ডের ইসলামবাগভূমিহীন সমবায় সমিতি ৮ নং ও ৯নং ওয়ার্ডের ব্রহ্মপুত্র বাস্তহারা কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতি দাবি করেছে বঙ্গবন্ধুর দান করা স্মৃতি আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রæতির প্রতি তাদের আবেগ চায় মানবিক বিবেচনা। রাতারাতি সম্ভাব্য উচ্ছেদ অভিযানের গ্যাড়াকলে পড়া নগর দরিদ্র সীমায় বসবাসরত হাজার হাজর পরিবার চরম ভাগ্যবিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন।
প্রশাসন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, ময়মনসিংহ বিভাগীয় সদর ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন উন্নয়নের জন্য মহা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। সেজন্য সরকারি সম্পত্তি দখলমুক্ত করা হবে। চলবে উচ্ছেদ কার্যক্রম। ব্রহ্মপুত্র তীরে সেই লক্ষ্যে উচ্ছেদ অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পরিকল্পিত মহানগরের উন্নয়ন যন্ত্রনায় ছিন্নমূল সাধারণ মানুষের উপর নেমে আসছে অশনি সংকেত।
সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রূপকল্প অনুযায়ী ছিন্নমূল ভূমিহীন মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ময়মনসিংহে বাস্তবায়িত হয় নগর দারিদ্র হ্রাসকরণ প্রকল্প। এ ক্ষেত্রে সাবেক ময়মনসিংহ পৌরসভা বর্তমান ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে সরকারি-বেসরকারি অর্থায়নে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ চলমান রয়েছে। সেখানে উন্নয়নের নামে শুরু হতে যাচ্ছে প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান। যদিও সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এই উচ্ছেদ না করতে মানবিক কারনে নৌ-মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন।
সূত্র মতে, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন থেকে বলা হয়েছে ব্রহ্মপুত্র তীরে যেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে সেখানে কলকারখানা বা অফিস আদালত হবার কথা না। সেখানে উচ্ছেদের আগে এলাকাবাসীর দাবি মোতাবেক কিছুটা সময় দেয়া দরকার। দরকার পুর্নবাসন।
গত কদিন ধরে শোনা যাচ্ছে, রেলের পর এবার ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে চলবে উচ্ছেদ অভিযান। প্রশাসন প্রস্তুত। অপেক্ষা কেবল আর মাত্র এক দিনের। মাইকিং হয়েছে ২০ ডিসেম্বর উচ্ছেদ অভিযান হবে। আগে বলা হয়েছিল ২৩ ডিসেম্বও এর কথা।
অন্যদিকে অসময়ে সম্ভাব্য উচ্ছেদের মুখে পড়া হাজারো পরিবার দিশেহারা। ৪০ হাজার লোকজন চরম মানবিক বিপর্যয়ের শিকার হতে যাচ্ছে। তাদের ৪৬ বছরের বসতি খালি করে দিতে বলেছে প্রশাসন। মাত্র ১৫ দিন ধরে হয়েছে মাইকিং। যাতে চোখে সর্ষে ফুল দেখছে নদী পাড়ের বস্তিবাসীরা।
প্রশ্ন উঠেছে- মাত্র এক মাসের মৌখিক নোটিশে উচ্ছেদ করলে এই শীতে মানুষগুলো যাবে কোথায়? উচ্ছেদ আতংক, উদ্বেগ তাড়া করছে তাদের। চরম দুঃসময়, অনিশ্চয়তা, ভাগ্যবিপর্যয়ের ছোবলে পড়া লোকজন অসহায়। তাদের পাশে কেউ নেই। বস্তিবাসীরা পুর্নবাসন ও সময় দাবি করে জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন বরাবরে ধর্ণা দিয়েছে।
উচ্ছেদ অভিযানের বিপক্ষে তাদের কোন দৃশ্যতঃ উত্তেজনা নেই, আছে ভয়। তাদের প্রত্যাশার মানবিক আবেদনে ছিল কিছুটা সময়ের প্রার্থনা। যে জন্য তারা প্রশাসনের বরাবরে দরখাস্ত দেন। ছিন্নমূল ভূমিহীনদের স্থায়ী পুর্নবাসন না হওয়া পর্যন্ত উচ্ছেদ না করার আবেদন জানান বস্তিবাসীরা। শত শত লোক গণস্বাক্ষর দেন। কিন্তু কোন কিছুই হয়নি। বুধবার পর্যন্ত জ্বলেনি আশার আলো, হতাশাছন্ন বস্তিবাসীরা যেন হতবাক। মূর্তিমান বিপদ দ্রæত ধেঁয়ে আসছে ব্রহ্মপুত্র উপকন্ঠে।
বস্তিবাসীরা জানায়, বরং আগে প্রশাসন ২৩ ডিসেম্বর থেকে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর ঘোষনা দিয়েছিল। এখন সেই তারিখ ৩ দিন এগিয়ে ২০ ডিসেম্বর হতে যাচ্ছে। প্রশাসনে বরাবরে আবেদন নিবেদন করার লাভ হয়েছে এইটুকু। এ নিয়ে চাঁপা উত্তেজনা চলছে জনমনে। পর্যবেক্ষক সূত্র জানায়, উচ্ছেদ অভিযান শুরুর তারিখ এগিয়ে এলেও আসন্ন উচ্ছেদের মুখেও নির্বিকার রয়েছেন বস্তিজীবনের অধিকারী হাজার হাজার মানুষ। তারা এখনো আশা করছেন তাদের আর্তি সরকারের কাছে পৌছবে। উচ্ছেদের খড়গ থেকে তারা নিস্কৃতি পাবেন। পুর্নবাসন বা আবাসনের ব্যবস্থার আগে উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত হবে।
এদিকে, গত নভেম্বর থেকে ময়মনসিংহ শহরে শুরু হয়েছে উচ্ছেদ কার্যক্রম। মধ্য নভেম্বরে রেলওয়ের জমিতে অবৈধ স্থাপনা ও বসতি উচ্ছেদ অভিযান চলে। এরপরই শুরু হয় ব্রহ্মপুত্র পাড়ে বেড়ি বাঁধ সংলগ্ন বস্তি উচ্ছেদের প্রক্রিয়া। প্রশাসন মাঠ পর্যায়ে নেমে আসে উচ্ছেদের এরিয়া ও লক্ষ্য চিহ্নিত করে এবং মাইকিং করে। সময় বেঁধে দেয়া হয় ২৩ ডিসেম্বর।
ইতিমধ্যে চরম উদ্বেগ, উৎকন্ঠার মধ্যে পড়েছেন রেলির মোড়ের ইসলামবাগের ছিন্নমূল ভূমিহীন মানুষ। একই অবস্থা থানা ঘাট ব্রহ্মপুত্র বালুরচর বাস্তহারাদের।
চরঈশ্বরদিয়া মৌজার সাবেক ২৮৪৫ দাগের ১ নং খাস খতিয়ানের জমিতে গড়ে উঠে ইসলামবাগ বস্তি। যেখানে রয়েছে প্রায় ২০ হাজার অধিবাসী। যারা নদীভাঙ্গনে ভূমিহীন ও ছিন্নমূল হয়ে জীবন জীবিকার তাড়নায় শহরে এসে আশ্রয় নেন। আকস্মিক উচ্ছেদ অভিযান তাদের মাথায় বিনা মেঘে বজ্রপাত এর মতো। তারা এখন হতবিহবল।
ইসলামবাগ বস্তি এলাকায় রয়েছে ৫ টি মসজিদ, ৩ টি মন্দির, ১ টি প্রাইমারী স্কুল ও ২ টি মাদ্রাসা।
জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষনা অনুযায়ী এলাকাবাসী ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন থেকে পূর্নাঙ্গ নাগরিক সুবিধা ভোগ করছেন। হাজার হাজার শিশু ও কিশোর বিভিন্ন স্কুল-মাদ্রাসায় এবং প্রায় ৩ শতাধিক শিক্ষার্থী বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। এ অবস্থায় উচ্ছেদ অভিযানটিকে ঘিরে বস্তিবাসীদের পুর্নবাসন বা অন্যত্র সরে যাবার পর্যাপ্ত সময় না দেয়াকে সচেতন নাগরিক সমাজ সহ মানবাধিকারকর্মীরা কড়া সমালোচনা করছেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বও নদীতীরবর্তী বস্তি উচ্ছেদের ক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনার জোর আহবান জানিয়েছেন।
সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানের ফলে নগরে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেনির মানুষ নিদারুন বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েন। এতে সামাজিক অস্থিরতাও চলে। বিশেষ করে রাতারাতি ঘরবাড়ি হারিয়ে চরম সমস্যার মধ্যে পড়েন পরিবারগুলো। শহরে ভাড়া বাসা হয়ে যায় কঠিন। যে পরিবার মাসে ২/৩ হাজার টাকা বাসাভাড়া গুনতে হিমসিম খেতেন, তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে আসে ১২/১৩ হাজার টাকা ভাড়া। অসহায় সেই পরিবারগুলোর বর্ণনাতীত দুঃখের গল্পের শেষ নেই। রেলের উচ্ছেদের পর এবারকার ছিন্নমূল বাস্তুহারাদেও সম্ভাব্য উচ্ছেদ সেই সাথে ময়মনসিংহে নতুন করে প্রায় ১০ হাজার পরিবারের বাসার সংকটের দিকটি সামনে এনেছে। এসব পরিবার কোথায় যাবেন, কোথায় উঠবেন, কিভাবে চলবেন সেই দুশ্চিন্তার মধ্যেই শুরু হতে যাচ্ছে উচ্ছেদ অভিযান। যা এসব পরিবারের জন্য মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাড়াতে পারে।


